বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

চন্দ্রাণী বসু

 


                                    অভিমান

                            প্রতিমা রায়বিশ্বাস 

 

হঠাৎ চেঁচামেমিতে ঘুম ভেঙে যায় রঞ্জনের।

ফ্ল্যাট বাড়িতে অভ্যস্ত স্ত্রী মিতার প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল এই বাসাটা ভাড়া নেয়ার ব্যাপারে। কিন্তু  প্রাক্তন মালিকের বেঁধে দেয়া সময়ে পছন্দ সই বাসা না পেয়ে বাধ্য হয়েই দুইরুমের, গ্যাস ছাড়া এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছিল।

বেলা এগারোটা বাজে। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই,বাচ্চাকে কি খাওয়াবে? কোন বন্দোবস্ত নেই। তা নিয়েই মিতার যুক্তি সংগত রাগ রঞ্জনের উপর।

ঠিক তখনই ফোনটা পেল । ফোন করেছে দিদি নীলা। প্রথমবার কেটে দিলেও দ্বিতীয় বার না ধরে পারলো না । কারণ সে জানে বিশেষ সমস্যা না হলে দিদি ফোন দেয় না।

ওপাশে দিদি কান্না জড়ানো কন্ঠে বললো,হ্যালো,রঞ্জন একটা দুঃসংবাদ আছে রে।

রঞ্জন বললো, →কি হয়েছে ?

তোর দাদাবাবুর বোন, অহনা মারা গেছে রে। 

হায়,হায়! কখন? কিভাবে?

গতরাতে। শ্বাসকষ্ট হয়েছিল।

এখন আমি কি করতে পারি

তোর দাদাবাবুকে ফোন করে দেখ কি বলে।

আচ্ছা। আমিও ভীষণ সমস্যায় আছি। 

কি হয়েছে? কি সমস্যা?

বাসায় গ্যাস নেই,বাথরুমে একফোঁটা পানি নেই,কারেন্ট নেই,ঘরে কোন খাবার নেই,দোকান পাটও সব বন্ধ। আমি এখন কি করি?

বউকে নিয়ে এখানে চলে আয়।

দাঁড়া ও কে বলে দেখি।,,,,না,ও আসবে না। 

তাহলে আর কি করবি? ওরা না এলে তুইই চলে আয়। 

আচ্ছা দেখি। 

নীলা একটু ভাত রান্না করে রাখলো। ভ্যাপসা গরম, আকাশের অবস্থা কখনো অন্ধকার, কখনো চড়া রোদ। না, তখনও রঞ্জন আসেনি। বারোটার দিকে পলার ফোন। হাসপাতাল থেকে বলছে,

রঞ্জনকে বল  শ্মশানের জিনিসপত্র গুলো দিয়ে যেতে। সনাতন কিনে রেখেছে। বলে ফোন রেখে দিল।

কতগুলো কাক কা কা করে চক্রাকারে ঘুরছে। মন উতলা হয়ে ওঠছে নীলার  শাশুড়ী মা কে জানানো হয়নি অহনার মৃত্যুর কথা।

এদিকে আকাশের পরিবেশ অনেকটা ভাল হলেও,নীলা জানে না এখন রঞ্জনের পরিবেশ কি? ভালো না খারাপ। পাশাপাশি দুটো সমস্যাই গুরুতর। তবুও ফোন দিলো উপায়হীন নীলা। বললো,,

একটা কাজ করে দিতে পারবি?

কি বল।

শ্মশানে কিছু জিনিস পত্র দিয়ে আসতে পারবি? কিছু করতে হবে না,ধরতেও হবে না। কাউকে ছুঁতে হবে না।দিয়েই চলে আসবি,পারবি

একটু চুপ থাকে রঞ্জন। হয়তো খুব সঙ্গিন তার পারিপার্শ্বিকতা। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে।

না পারলে বল। আমি অন্যকেউ কে দেখে ডেকে পাঠাবো। 

না,ঠিক আছে,আমিই দিয়ে আসবো। গুছিয়ে রেখে দে। আসছি।

গুছানোই আছে। 

কিছুক্ষন পরে রঞ্জন এসে দিয়ে এলো। 

রঞ্জন কাউকে ছোঁয়নি। জিনিসগুলো দিয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিল। কথা বলেছে দূরত্ব বজায় রেখেই।

পলা তার বোনকে, বিজন তার স্ত্রীকে, ছেলে তার মাকে সর্ব শক্তি দিয়ে ভাঙা বুকে মাথার উপর দিয়ে চিতায় তুলে দিল। করোনা রুখে দিলো মানবিকতা। সেচ্ছায় কেউ আসেনি সাহায্য করতে। ডাকেনি ওরাও। যার চলে যায় সেই তো জানে কতোটা বেদনা।  

বিমর্ষ সন্ধ্যা নামিয়ে সূর্য পাটে গেছে, নেমে আসছে অন্ধকার। শেষ হয়নি দাহ, কেউ কেউ চলে যাচ্ছে। চলে এসেছে রঞ্জনও। বৌকে বলেছিল একটু গরমজল বসাও, স্নান করে দোকানে যাবো। 

মিনিট পাচঁ পরে ফিরে এসে দেখতে পেলো সামনে আগুন পাহাড়। তার বউ। বল্ল 

শ্মশানে গেছলি ক্যান? ',--শ্মশানে গেছলি ক্যান?কথা কস্ না ক্যান

রঞ্জন বলে, আমি কিচ্ছু  ছুঁইনি,ধরিনি। শুধু জিনিসগুলো দিয়ে এসছি। সরো তো, যাইতে দাও।

এক পাও এগুবি না। বাসায় ঢুকলে খুন কইরা ফেলামু। যেভাবে আইছস হেইবায় যা।

লজ্জায় অপমানে রঞ্জন কথা বাড়ায় না। আবাসিক এলাকার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর কথায়  নাজেহাল হওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই উত্তম মনে করলো।  

মিতা ভাবেনি রঞ্জন চলে যাবে। তার নিজেকে পরাজিত মনে হতে লাগলো। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, করোনার রোগী মারা গেলে বাপে যায় না ছেলেরে দেখতে, ছেলে যায় না বাপেরে দেখতে সে ক্যান গেছিলো? সে ক্যান গেছিলোসে কি কাঁচা আবু? যুগের বাও বুঝেনা

রঞ্জন যেতে পারতো মায়ের কাছে। অথবা দিদির বাসায়। কিংবা কোন বন্ধুর বাসায়। না, সে কোথাও যায়নি।

অভিমান বুঝেনি কেউ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন