ব্যাঙের ছাতা
প্রতিমা রায় বিশ্বাস
শীতের হালকা একটা ছোঁয়া লাগছে ভোরের দিকটায় পাতলা ব্লাঙ্কেট ছাড়া একাকী রোগের
মতো জড়িয়ে ধরছে আজকাল ম্যালনারিসড ঘুমকে।দীর্ঘশ্বাস পুরোনো হতে হতে এখন আর তেমন দীর্ঘ লাগে না।মাসির
গেটের খটখট শব্দে চোখ খুলেই প্রথমে ঠাকুর ঘরের দিকে মুখ করে প্রণাম করে
রিদিমা।তারপর গেটের তালা খোলে। দৌড়ানো কায়দায় মাসি ঘরে ঢোকে।এভাবেই দিনের দৌড় শুরু
হয়।
তবে ঘরের মধ্যে
মাঝে মাঝে যে
ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে অদৃশ্য টর্ণেডো তা কি করে সহ্য করবে রিদিমা বুঝতে
পারছে না।অনেক ভেবেছে বাবা মাকে বলবে?সন্তানদের বলবে?নাঃ কাউকেই ভরসা পাচ্ছে না।কাউকেই বোঝা যাচ্ছে
না ওরা যে পাপড়ি মেলে রেখেছে তার রংটা আসলে কী?অথচ তার সম্পূর্ণ পরিশ্রম ঘিরে এদের প্রয়োজন প'ড়ে আছে। এদের মধ্যে কারো বাজার করে রান্না না
করে দিলে খাওয়া হয় না।কারো ছেলে বৌমার সঙ্গে সমস্যা হলে রিদিমাকেই তদারকি করে
মেটাতে হয়।যা কিছু প্রয়োজনে রিদিমা অথচ তার প্রয়োজনে সবাই কেমন যেন না ফোটা কুঁড়ির মতো মুখ বুজে থাকে।কিন্তু এভাবে
তো আর সহ্যও করা যাচ্ছে না।কতদিন আর কতদিন? ঝড়ের দাপটে তছনছ হয়ে থাকা সংসার অথচ ফুলদানীর
একটি ফুলও এদিক ওদিক হয় নি।একটি বাসন পড়ার শব্দও হয় না।
দিনের পর দিন না ব'লে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া লোকটার হদিশ কেউ জানে না।ফোন করলে 'সুইচ অফ',একা খায়।সংসারের খোঁজ রাখে না। রান্নার জন্য
মাসি রেখেছে।তার বক্তব্য চাকরি শেষ টাকা শেষ।সুতরাং কাউকে খাওয়ানোর মতো ক্ষমতা তার
নেই।
রিদিমা কী বলবে বুঝতে পারে না।ভাবতেও পারে না আজকাল ঠিকঠাক।সে বাচ্চাদের নিয়ে
যা পারে তাই খায়।রান্না ঠিক মতো না হলে বাচ্চাদের বকা খায়।অফিসে যেতে যেতে জ্যাম
খায়।গরম খায়।ঠান্ডা খায়।খেতে খেতে এখন তার খাওয়ার রুচি একদম কমে গেছে।এখন মৃত্যুতেও
কেমন অরুচি স্বাদ।
রিদিমা ভাবে ওরও কী এভাবে ঘরে না ফেরা অভ্যাস করা উচিৎ?
কী কী হতে পারে যদি ওও বাইরের থেকে ঘুরে ফিরে তিন চার দিন পর ঘরে ঢোকে।
এসব করলে তো করাই যায়।
কিন্তু।
এই
" কিন্তু " শব্দটি আওয়াজ হয়ে চতুর্দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে , অথবা দশদিক।
মানসম্মান এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হবে।এসব ভাবতে ভাবতে কাকের ঠোঁট
থেকে ফেলে দেওয়া দুঃসংবাদের মতো রিদিমা প্রহর গোনে।
ভবিষ্যৎ কী সত্যিই নিশ্চিত হয়?
যেখানে সে যে কারো মা একথা মাঝেমধ্যে অনিশ্চিত করে তোলে বাচ্চাদের
কথাবার্তা।সে যে কারো স্ত্রী একথাও বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রতিবেশী বাতাস
ধাক্কা দিয়ে বোঝায় নি কখনও।
তবে কিসের এত ভাবনা ভাবে রিদিমা?
তবে কী এই ভাবনার মধ্যে জিইয়ে আছে আজও ভারতবর্ষের সংস্কার?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন