একটি শীতের রাত
স্মৃতি শেখর মিত্র
সময়টা ছিল ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষাশেষি। ঠিক হল আমরা মালদা যাবো।
অর্থাৎ আমি আমার দুই শিশুসন্তান, স্ত্রী ও শালাবাবু। আমরা তাই রাত আটটা নাগাদ
টেঁয়া এসে বসে আজিমগঞ্জ লোকাল ধরার জন্য। এবং আজিমগঞ্জ থেকে আমাদের মালদা যাওয়ার
কথা। সেজন্য আমরা টেঁয়া স্টেশনে মালদা এক্সপ্রেস ট্রেনের রিজার্ভেশন করে নিলাম।
আজিমগঞ্জ লোকাল যখন টেঁয়া স্টেশনে ঢুকলো তখন স্টেশনের
ঘড়িতে রাত নটা। বেশিরভাগ বগি খালি থাকায় আমরা অনায়াসে একটি বগিতে ঢুকে সবাই
এক জায়গায় বসে পড়লাম। আমরা বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে এসেছি। বাচ্চাদের জন্য
পরোটা আলু ভাজা ইত্যাদি নেওয়া হয়েছে। যদি রাস্তায় ওদের খিদে পায় তো দেওয়া
হবে। সঙ্গে দু বোতল
খাওয়ার জল।
ট্রেনের মধ্যে বেশি মানুষজন চড়েনি। আমরা সবাই এক জায়গায় গল্পগুজব করছি এমন সময়
পরের স্টেশনে একজন মানুষ চড়লেন।
তিনি ফেরিওয়ালা। লজেন্স, চানাচুর, চিঁড়ে ভাজা, খেজুর ইত্যাদি খাবার জিনিস ফেরি করেন। তিনি
অত্যন্ত সদাশয় ব্যক্তি।কথায় কথায় আমাদের জানালেন আজিমগঞ্জ স্টেশনে রাতের বেলায়
অনেক আওয়ারা গোছের মানুষ জনের আড্ডা স্থল।
আপনারা ওখানে নেমে সোজা স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে দেখা মালদা এক্সপ্রেস ট্রেনে
মালদা যাওয়ার কথা জানাবেন এবং রাতের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করবেন।
আমাদের ট্রেন যখন আজিম-গঞ্জে পৌঁছা তখন গভীর রাত। সে সময় প্লাটফর্মে যাত্রী বসে
আছেন। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য যার যা সম্বল তাই ঢাকা নিয়ে বসে আছেন। আমরা গুটি
গুটি স্টেশন মাস্টারের অফিস রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমি ও আমার শালা দুজন মিলে
স্টেশন মাস্টারকে রাতে থাকার জন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ের কথা জানালাম। উনি রাতে
আমাদের থাকার জন্য তাঁর রুমের পাশেই একটা রুমে থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন। উনি
বললেন আমাদের ট্রেন লেট আছে পরদিন সকালে আসবে। সেই মতো আমাদের হাতে দুচার ঘণ্টা
সময় আছে। স্টেশন চত্বরে বিশেষ মানুষজন নেই। একে তো শীতের রাত তাই কনকনে শীত
পড়েছে এখানে। কয়েকজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে গল্পগুজব করছেন।
চতুর্দিক শুনশান। মাঝে মাঝে রাস্তার কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
বাচ্চাদের কোন রকম ভাবে ঢাকাঢুকি দিয়ে কম্বল পেতে শুইয়ে দেওয়া হল। আমরাও
দুচার ঘণ্টা হাতে সময় থাকায় একটু বসে বসে জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। একটু
ঢুলুঢুলু ভাব এসেছে দুচোখের পাতায়। হঠাৎ শুনতে পেলাম কিছু মানুষের হৈ
হট্টগোল। বাইরে এসে দেখি একজন মহিলাকে তাড়া করে দৌড়াচ্ছে কয়েকজন পঁচিশ
ত্রিশ বছরের যুবক। কি ব্যাপার জানতে চাওয়ায় জানতে পারলাম মেয়েটি প্রতিদিন রাতে
স্টেশন চত্বরে এসে তার খদ্দেরের খোঁজ করে। ঐ ছেলেগুলির সঙ্গে দরদাম ঠিক মত না
পোষানোয় ও পালানোর চেষ্টা করে। আর ঐ ছেলেগুলি মদ্যপ অবস্থায় থাকার জন্য ওকে ওরা
ছাড়বে না। স্টেশনের যাত্রীদের এ ব্যাপারে কোন হেলদোল নেই। রোজকার এই ঘটনায় ওঁরা
অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আমরাও পরিবার নিয়ে আনজান জায়গায় কোন কিছু করার ঝুঁকি নিলাম
না।
বসেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম।
সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন