বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

উৎপল পাল


সেলাই মেশিন

উৎপল পাল


একুশ বছর পর আজ রমলা দেবীর বৃদ্ধাশ্রম বাস শেষ হবে। তার আনন্দ অশ্রুতে মনে পরে যাচ্ছে অতীতের অনেক কথা। তুহিনের বয়স তখন মাত্র আট বছর। একটা ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যায়। রেল কর্তৃপক্ষ মৃত বক্তিদের পরিবার পিছু দু লক্ষ টাকা দিয়েছিল। সেই টাকায় রমলা দেবী একটা সেলাই মেশিন কিনেছিলেন আর বাকি টাকা তুহিনের পড়াশোনার জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন। বাড়িতে বাচ্চাদের পোশাক বানিয়ে বিক্রি করে যা আয় হত তা দিয়ে মা ছেলের মোটামুটি চলেই যেত। রমলা দেবী দিনরাত সেলাই মেশিন চালিয়ে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। ছেলে একদিন মস্ত বড় হয়ে তার কষ্ট দূর করবে। ছেলেও মায়ের স্বপ্ন পূরণের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল। মাধ্যমিকে দ্বিতীয়, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম। তারপর কলেজ। শেষে নামি কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি। অতঃপর বিয়ে। পুরোনো সবকিছু ছেড়ে তারা এলেন নতুন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। ঠিক দু বছর পর রমলা দেবী ঠাম্মী হলেন। নাতির নাম রাখলেন সুজয়। কিন্তু সুজয়ের আধুনিকা মা সুশ্বেতার তা পছন্দ হলোনা। শুরু হলো সংঘাত। ছোটো ছোটো বিষয় হতে লাগলো অনেক বড়ো। তুহিন এসব ব্যাপারে নীরব। কারন মোটা মাইনে দেওয়া বসের মেয়ের বিপক্ষে যাওয়া তার কাছে স্বার্থপরতা। এত কিছুর পরেও রমলাদেবীর বেদনা এক নিমেষে শেষ হয়ে যেত সুজয়ের হাসি মুখ দেখে। সুজয়ও ঠাম্মী অন্তপ্রাণ। রমলাদেবীর কপালে সে সুখও সইল না। সুজয়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। সুশ্বেতা ফ্ল্যাটের বাস্তু পরিবর্তন করতে গিয়ে পুরোনো সেলাই মেশিনটা দেখে বলল, "আমার বাবার দেওয়া দামি ফ্ল্যাটে এসব জিনিস মানায়না"। তুহিন মাকে বলল এসবের আর কি দরকার? অশান্তি বাড়তে বাড়তে যখন চূড়ান্ত, তখন সিদ্ধান্ত হলো বৃদ্ধাশ্রম। রমলা দেবী সেলাই মেশিন নিয়ে চলে এলেন বৃদ্ধাশ্রমে।

আজ একুশ বছর পর বৃদ্ধাশ্রমে সুজয়ের ফোন।

সে বলল "ঠাম্মী আমি তোমাকে নিতে আসছি। তুমি আমার কাছে থাকবে। আমার বাড়ি..... না না তোমার বাড়িতে"। আমি আসছি।

        সকাল থেকেই গোছগাছ চলছে। বৃদ্ধাশ্রমের সবাই আনন্দ করছেন। আজ তাদের দর্জি দিদি চলে যাবেন। রমলাদেবী ঘোলা চশমায় দেখতে পাচ্ছেন আগামী দিনের রঙিন ছবি। হঠাৎ তার মনে পড়লো সুজয় রাবড়ি খেতে ভালোবাসে। ব্যস বেরিয়ে গেলেন নাতির জন্য রাবড়ি আনতে। কিন্তু ছোটো রাস্তা পেরিয়ে যেই বড়ো রাস্তায় উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে এক বেপরোয়া লরি তার সমস্ত আশা, স্বপ্ন ভালোবাসাকে রাস্তায় পিষে দিয়ে গেল। পরে রইলো তার নিথর রক্তাক্ত দেহ.......।

         সুজয় আজও তাঁর সেলাই মেশিনটিকে নিজের কাছে রেখেছে। তার নিজের বাড়ি..... না ঠাম্মীর বাড়িতে।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন