টাকডুমাডুম
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
দিনরাত একই চিন্তা গগনবাবুর। মানে গগন সেনগুপ্ত। ছা পোষা কেরানি। মাইনে যা পান তাতে সংকুলান হয় না। বয়সটা পঞ্চান্ন বটে তবে দেখলে পঁয়ষট্টি মনে হয়। যার কারণ ওটাই। গগন বাবুর মাথা ভরা টাক। এই টাক টাই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল। ওটাই অশান্তির কারণ। সে দিন হঠাৎ আয়নার সামনে হঠাৎ এসে পরেন। আঁতকে ওঠেন যেন। একি! কাকে দেখছেন। চোখে অজান্তেই জল এসে যায়। কত সুন্দর একমাথা চুল ছিল। কী অবস্থাটাই না হয়েছে। এই সংসারের চিন্তাতেই সব গেল। অথচ দেখো। সংসারের মানুষ গুলোকে। অকৃতজ্ঞ কাকে বলে। সময় পেলেই টাক নিয়ে টিপ্পনি। স্ত্রী সুজাতার বয়স পঞ্চাশে ঠেকেছে। বেশ আলগা একটা চটক এখনো আছে বৈকি। বিয়ের প্রথম প্রথম কত প্রেম। তুমি আমার। আমি তোমার। আর এখন। সে দিন তো মুখের উপর বলেই দিল যা একটা টাক বানিয়েছ। কোথাও যেতে ইচ্ছাই করে না। হায় কপাল! কে যেন বলেছিল মেয়েরা মুখেও যা প্রাণেও তাই। এটা আর মানা যায় কি? অন্য কেউ বললে কথা থাকে। ধর্মপত্নী বললে ব্যথাটা শতগুণ লাগে বৈকি। আপাত নিরীহ গগনবাবু সহ্য করেন। শুধু কী তাই? ছোটছেলেটাও লায়েক হয়ে উঠেছে। সবার সামনে সে দিন বললো, তোমার মুখ আর মাথার সীমানা বোঝা দায়। কাঁদতে বাকী থাকে গগন বাবুর। এটা একটা জীবন? পাড়ার লোকেরাও তেমনি। তার বাড়ির ঠিকানা হয়েছে টেকো দাদু বা টেকো কাকার বাড়ি। হায়!এই টাকটা গগন বাবুর জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করছে। জামাইষষ্ঠী। মেয়ে জামাই এসেছে। হাজারো পদ। নাতিটা খুবই দুষ্টু হয়েছে। কোন এক গানে কেওড়ার পরিবর্তে এ টাকলা বলছে আর কোমড় দোলাচ্ছে। ঘরের শত্রু বিভীষণ। সুজাতা তো হেসে গদগদ। উফফফ!এই হাসি দেখে এক দিন অস্থির হতেন গগন বাবু। এখন মনে হচ্ছে কিষ্কিন্ধ্যার বানরী। ছিঃ। ধিক্কার। ধিক্কার। পরদিন অফিসে গিয়ে ঘেমে গেছেন গগনবাবু। জষ্ঠি মাসের গরম। ফ্যানটা চালিয়ে চেয়ারে বসতে যাবেন আর বাসু বলে উঠলো টাকটা তো ভিজে গেছে দাদা। তোর কী রে বলে কী একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন গগনবাবু। ওদের মত অসভ্যতা শেখেন নি উনি। আজ অনেক দিন পর লটারী তে টাকা পরেছে। দু লাখ টাকা। উৎফুল্ল গগনবাবুর যেন ধড়ে প্রাণ এসেছে। বাড়ির সবাই তাকে নিয়ে গদগদ। সুজাতা অনেক দিন পর গগন বাবুর টাকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। সোহাগের সুরে বলছেন কী গো? এবার সোনার হার দেবে তো? ছোট ছেলেটা বাড়ি থেকে যাবার আগে গগন বাবুকে ঠক করে একটা প্রণাম করে বললো, গাড়ি কিনতে পঞ্চাশ হাজার দিও বাবা। কিছুক্ষণ পরেই খবর পেয়ে মেয়ে জামাই হাজির। মেয়ে হাসতে হাসতে বললো, নাতিটার জন্য কিছু টাকা দিও কিন্তু। দশটা নয়, পাঁচটা নয়, একটাই নাতি। গগনবাবু দেখলেন টাক এর প্রসঙ্গ টাই হঠাৎ উবে গেছে। বাসুও অফিসে দু হাজার টাকা চেয়েছে কাঁদো কাঁদো হয়ে। হায় কপাল! একটা আ কারের এত ক্ষমতা গগনবাবু আজ তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলেন। মনে মনে গেয়ে উঠলেন মাথাভরা টাক দিলি টাকা দিলি না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন