বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

সোনালী মিত্র

 

স্পর্শ  \ সোনালী মিত্র

 

এক টাকা, দুই টাকা পাঁচ-টাকা এবং পঞ্চাশ পয়সার কয়েন হাতের স্পর্শে  গুনে দেখল একশ তেরো-টাকা পঞ্চাশ পয়সা । দয়াময় মন্দিরের সামনে প্রথম বাটি-পেতে বসে ছিল তাও, তাও কি বছর-ত্রিশ হয়ে গেল ? পনেরো বছর বয়সেই নেমে পড়েছিল  লাইনে । সেবার মায়ের গায়ে আগুন লাগিয়ে বাপ কোথায় হাওয়া হয়ে গেল। ভাড়াবাড়ির লোক আর কত দিন বিনা ভাড়ায় রাখবে তাকে । কোনো এক  দূরসম্পর্কের পিসি কিছুদিন নিয়ে গিয়েছিলেন তার বাড়িতে । অন্ধ ছেলেকে কেই-বা আর দেখে !  কত দিন বাদে  আজকে আবার  ভাবতে ইচ্ছা করছে খুব । দয়াময় মন্দিরে বসতেও কী কম কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল ? হিন্দু মন্দিরে ম্লেচ্ছ ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বসবে এটা অনেকে মেনে নিতে পারেননি । কত উত্থান পতনের সাথী থেকেছে  এ জীবন । সেবার কারা যেন মন্দিরের সামনে রাতের অন্ধকারে গরুর মাথা কেটে রেখে গিয়েছিল । তাই নিয়ে সে-কি হুজ্জুত । প্রাণ যায় -যায়  যায়নি পুরোহিত দেবল ভট্টাচার্যের সৌজন্যে । '' বেচারা দীর্ঘদিন মন্দিরের সামনে ভিক্ষা করছে, ওকে ছেড়ে দাও, বেচারার কেউ নাই । '' শ্রদ্ধা ভক্তিতে চোখে জল এসে গিয়েছিল  তারপাশে  বাটি নিয়ে বসে বিমল মিস্ত্রী । তাও নাই নাই করে প্রায় ১৫বছর হয়ে গেলো । ঝড় হোক, হরতাল হোক কেউ আসুক বা না আসুক তাদের দু'জনাকে মন্দিরের সামনে দেখেনি , এমন মানুষ নেই ।  বিমল চাচার বয়স বোধকরি তাও তিন কুড়ির বেশি বই কম নয় । একটা মাত্র ছেলে ছিল , সে কোন  লোহা কারখানায় কাজ করত। সেবার কী একটা  এক্সিডেন্টে ছেলের দু'টো হাতই কাটা যায় ।  চাচাকে  পেশাতে নামতে বাধ্য করল হাত কাটা সময়  ছেলের ঘরে একটা মাত্র বছর ৮এর ফুটফুটে মেয়ে অহনা । মাঝেমধ্যে এখানে আসে স্কুলে যাওয়ার আগে । দাদুর বাটি থেকে ১ টাকা , ২ টাকা তুলে নিয়ে পালায় । নিজের দাদুর সঙ্গে যখন আমায় ও দাদু বলে ডাকে , বুকের মধ্যে স্নেহ ভালোবাসার এমন ঝড় উঠবে আমি কি ভাবতে পেরেছি কোনো দিন ? কতো দিন স্বপ্ন দেখেছি , এমন ফুটফুটে একটা নাতনি থাকবে , সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরলে পিঠের ওপর চড়ে বলবে '' নানা , ঘোড়া হও । '' নাহ , জীবনে কেউ তো এলো না । কেউ তো বলল না , '' শাহজাহান শাদী করবি ? '' তার নিজের জীবনে খরচ কই ? যা পায় তাতেই বেশ চলে যায় । দুপুরে পোস্ট অফিসে বড় বাবুকে বলেছিল আমার জমানো সব টাকা দিতি হবে বাবু । নাহ , মেয়েটাকে মরতে দিতি পারিনে । বিমল চাচার পরীকে বাঁচাতেই হবে । কর্কটরোগ যতই বাসা বাঁধুক অহনার শরীরে , মরতে দিতি পারিনে । ১লাখ সাতাশ হাজারের চেক পেয়েছে আজ পোস্ট অফিস থেকে । বিমল চাচার হাতে শাহজাহান তুলে দিয়ে বলে , ''নাতি যে আমার ও চাচা ।''  বিমলের চোখে জল বাঁধভাঙে । শাহজাহান বলে , -  কেঁদো না , একদিন কিন্তু নাতিকে পিঠে চাপিয়ে ঘোড়া হব আমি ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন