বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

তৈমুর খান

 


                               আমন্ত্রণ 

                                তৈমুর খান 

 

সারা রাস্তা লোকটি বকবক করতে করতে গেল। 

মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে এ রকম বকবক শুনতে হবে জানতাম না। ওর কথা শুনি আর মাথা নাড়ি। হ্যাঁ হুঁ করে চলে যাই। তিনি এর আগে কোনোদিন আসেননি এ রাস্তায়। আমার সঙ্গে তার দেখাও হয়নি। প্রথমে এভাবে শুরু করলেন :

আমি ওই স্টেশনের রাস্তা ধরে যেতাম, এদিকে আসতাম না। ক'দিন থেকে ও শালারা এসেছে আর ছেলেমেয়েদের রাস্তায় হাগাচ্ছে । ভোর থেকে উঠেই…. 

      মাঝখানে ওকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম :

—কাদের কথা বলছেন? 

—ওই তো শালা পাকিস্তানিদের! 

—পাকিস্তান থেকে এসেছে নাকি? 

—পাকিস্তান থেকে আসবে কেন?ও তো শালা মুছলমান! 

—অ, তাই বলুন ! 

—আরে দেখুন না ! বাংলাদেশ ভালো খেলছে বলে ওরা বোম ফাটাচ্ছে। পাকিস্তান জিতলেও ওরা এ রকম করে। 

—সত্যিই এটা অন্যায়। 

—বিরাট অন্যায়। এই জাতটার মধ্যে এখনও দেশপ্রেম দেখলাম না! এক দেশে বাস, অন্য দেশের প্রতি ভালবাসা ! 

—এটা হওয়া উচিত নয়। ভারতই তো ওদের মাতৃভূমি, তবুও! 

—আসলে ওরা দেশেরই ক্ষতি করছে। গরু খাচ্ছে আর জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে। সন্ত্রাসী কাজকর্ম করছে। চার পাঁচটা বিয়ে করে কথায় কথায় তালাকও দিচ্ছে। 

—তা হলে তো এই দেশ একদিন পাকিস্তান হয়ে যাবে ! কী বলেন ! 

—তা তো হয়ে যাবেই। এই কারণেই এবার সরকারের পরিবর্তন। ওই শালার জাতটা জব্দ হবে। এন আর সি করে ওদের বিদেশী ঘোষণা করা হবে। নাগরিক অধিকার থাকবে না। 

—সেই পথেই তো এগোচ্ছে দেশ। 

—এটাই তো সারা দেশের মানুষ চাইছে। 

—তা ঠিক। 

—দেখুন, আমরা এখন খুব সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধও। হিন্দুজাগরণের একটা প্রবল ঢেউ চারিদিকে। 

—দেখতেই পাচ্ছি। 

      কথায় কথায় কখন আমরা পথ অতিক্রম করে গেছি। এবার ফেরার পালা। রোদও উঠে গেছে । তিনি এবার বললেন :

—আরে ভাই, আপনার পরিচয়টিই জানা হয়নি। কতদিন হল এপাড়ায় এসেছেন? 

—এই তো বছর দুয়েক হবে। 

—কী করেন? 

—স্কুলমাস্টারি। 

—অ, বদলি হয়েছেন বুঝি! 

—হ্যাঁ দাদা, বদলি হয়ে এইচ জে এ বিদ্যাপিঠে এসেছি। 

—বেশ বেশ, খুব ভালো। আমার বাবাও শিক্ষক ছিলেন। 

 —আপনি কোন্ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন! 

—আমি ছিলাম ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টে। দু বছর হল অবসর নিয়েছি। আপনার নামটা কী জানতে পারি? 

তার প্রশ্নের উত্তরে আমার নামটা বলতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল নিমেষের মধ্যেই । জোড়হাত করে বললেন :

—ক্ষমা করবেন, আপনাকে আমি চিনতেই পারিনি। কত কথাই না বলে ফেলেছি ! 

      আমিও হাতজোড় করে বললাম :

 —আমি অপেক্ষা করব যদি আমার ঘরে এক দিন আপনার চরণধূলি দেন !



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন