বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

জয়া গোস্বামী

 

                                   চটি জোড়া 

                                     জয়া গোস্বামী  

 

সে দিন কেয়া সকাল থেকে একটু খুশিতে আছে । মনে শান্তি আছেসারাদিন টিউশন পড়াতে পড়াতে মনটা অসহ্য হয়ে উঠেছে তাও সে খুশি। বাবার কারখানায় কাজটা চলে গিয়েছে অনেক দিন হয়েছে। ওর উপর সংসারটা, পুরো ওর কাঁধে এসে পড়েছে l সে মুখে কিছু বলে না, হাসি মুখে মায়ের সাথে কাজ করে আর বাচ্চাদের পড়াতে ব্যস্ত থাকে l কি করে দুটো পয়সা হবে এই ওর আশা। ওর বন্ধুরা অনেক কথা বলে l ও সে দিকে কান দেয় না l গরিব মানুষ নিজেদের নিয়ে থাকে । আর ছোট বেলার বন্ধু হিমু ওর খুব প্রিয়, ও আসে ওর সাথে কথা বলে । ও এলে ইদানিং একটু বেশি খুশি হয় কেয়া, হয়ত বয়েসের জন্য হবে এটা। এই ভাবে ওরা কবে বড় হয়ে যায় বুঝতে পারে না l একটা একটা করে দিন যায় আর মনের কোনে নতুন সংসার পাতার স্বপ্ন এসে ভিড় করে l ওর খুব ভালো লাগে, কল্পনার জগতে হিমুকে ও রোজ স্বামী হিসেবে দেখে l এভাবে অভাবের সংসারটা চলছে l গ্রামে মেলা এলো l ওর খুব সখ যাবে মেলাতে l একটু একটু করে পয়সা জমায় মেলার জন্য l সখ কাঁচের চুড়ি পরবে l এটা সেটা কিনবে এসব চিন্তা করতে করতে ওর দিন চলে যাচ্ছে । মা দেখে মেয়ে আজ কাল একা একা হাসে, কথা বলে । মায়ের মনে ভয় জন্ম নেয় এটা আবার কি হচ্ছে! মেয়েকে সে দিন কাছে ডেকে অনেক বুঝিয়ে বলল, তুমি যেটা করছ মা সেটা ভুল--হিমুরা বড়লোক ওদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব হতে পারে না l কেয়া ভাবে, মা তুমি ভুল করেছো। সে চুপ করে মার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে, মা ভুল ভাবছে, এটা হবে না  হিমু তাকে খুব ভালোবাসে । ও সে দিন মাকে বলে, আমি মেলায় যাবো মা

খুব খুশি হয়ে মা মাথা  নেড়ে মেয়েকে অনুমতি দেয় । সারাদিন নিজেকে নতুন করে সাজাতে থাকে কেয়া, একটি শাড়ি তাও মলিন, কি ভাবে যাবে ও ? তাও ওটাই পরে সে যাবে ঠিক করে নেয়, এই করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো l আজ হিমু ওকে কি বলবে ? তার জন্য ও উদগ্রীব হয়ে আছে l মনে মনে ভেবে নেয়, কেয়া ওদের বিয়ের কথা বলবে

আকাশ কুসুম চিন্তা নিয়ে পথে হাঁটতে লাগলো কেয়া। কিছুটা যেতে গিয়ে ওর এক পাটি চটি ছিঁড়ে যায় l কি করবে ভেবে পায় না সে--কি ভাবে যাবে হিমুর কাছে । মনে মনে কেঁদেই ফেলে সে, হাতে একশত টাকা, কি করবে তা দিয়ে সে? চটিজোড়া কিনবে নাকি যাবে হিমুর কাছে । চিন্তায় পড়ে যায় সে l সে নিজের জন্য চিটি কিনে পরে নেয় l একটু দেরি হয়ে যায়, এই সব কেনাকাটা করে গিয়ে যখন পৌঁছল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে l হিমুর সাথে দেখা করবে ভেবে ভেবে খুশিতে সে শেষ হয়ে যাচ্ছে l কি বলবে আজ ওকে । 

কেয়া দূর থেকে দেখল দাঁড়িয়ে, হিমু, ওর জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু পাসে ও কে ! চিনতে পারছে না--নাকি চিনতে ওর মন চাইছে না ! হিমু চিৎকার করে ওর নাম ধরে ডাকল, কেয়া

কেয়া অস্তে করে সারা দিলো, আমি এখানে 

কেয়া দেখে ওর বান্ধবী মালা হিমুর হাত ধরে দাড়িয়ে আছে। এক মুখ হেসে হিমু ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, অনেক কথা বলার পরে হিমু বলতে লাগলো, কেমন দিলাম বল

কেয়া আবার আস্তে করে বলতে লাগলো, জবাব হয় না--হিমু খুব সুন্দর--তোদের দুটিতে মানাবে, বলে হন্তদন্ত হয়ে পেছন ফিরে বাড়ির পথে রওনা হল কেয়া । সে হাঁটতে লাগলো আর মনে মনে বলতে লাগলো, গরিবদের স্বপ্ন দেখতে নেই, যার পায়ের এক জোড়া চটি জোড়া থাকে না তার কিসের আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখা !



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন