বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

জেবুননেসা হেলেন

 

                                      হাঁচি 

                                জেবুননেসা হেলেন

 

মিঠির কয়দিন যাবৎ মন খারাপ। কারণ করোনার জন্য লকডাউন চলছে। মুক্ত আকাশ, পাখি, ফুল বা নদী কিছুই দেখতে পারছে না।

মিঠি জানে নিসর্গই ওর আপন। গালে হাত দিয়ে মাঝে মাঝে সে জানালায় মুখ করে ভাবে, কবে এই কোয়ারেন্টাইনের দিন ফুরাবে !

আচ্ছা, আর এন এ এই ক্ষুদ্র ভাইরাসটার প্রতিষেধক কেন সেই ডিসেম্বর থেকেও বিজ্ঞানীরা বের করতে পারছে না?

ভাবতে ভাবতে তার অন করা ম্যাসেঞ্জারে টুক করে শব্দ হলো। মন খারাপ ভাবটা নিমেষেই উবে গেলো। ঝলমলে একখণ্ড রোদ ভেসে উঠলো ওর সারা মুখে। রোদের আলোতে এক টুকরো লজ্জাও ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিতে দেখা দিলো।

অর্হ ! হ্যাঁ অর্হ ই তো ! বহুদিন পর তার ম্যাসেজ এলো।

ছোট্ট বেলার সাথী। কত কত দিন ওরা এক সাথে আম চুরি করেছে। কত কত দিন সারা দুপুর ঘুড়ির সূতোয় মাঞ্জা দিয়ে বিকেল গড়িয়ে গেছে।

অর্হ ! আই টি ইঞ্জিনিয়ার। কানাডা থাকে। মনে মনে মিঠি অর্হকেই ভালোবাসত। এখনও শিহরিত হয় ওকে মনে পড়লে। কিন্তু! অর্হ ! না।সে মিঠির কালো মুখের দিকে কোনো দিন ফিরেও তাকায় নি।

- হ্যালো !

ম্যাসেজ আসার সাথে সাথে মিঠি লিখলো," কেমন আছো?"

- ভালো।তোমাদের খবর বলো।

- আছি, ঘর বন্দী। বাংলাদেশে কোয়ারেন্টাইন চলছে। করোনার জন্য।

- আরে ধুর ! কিচ্ছু হবে না। মরতে তো একদিন হবেই।

অর্হর সেই সাহসী উচ্চারণ। যেন সেই কিশোর ডোন্টকেয়ার বালকটি কথা বলছে।

- তা বটে। কিন্তু অসময় মৃত্যুকে কামনা করে?

-তা ঠিক। আমাদেরও কোরেন্টাইন চলছে। ঘরে বসে অফিস করি। চিন্তাফিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

- হলেই ভালো। তো, তোমাদের রাষ্ট্র প্রধান টুডো তো তোমাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতিবব্ধ। আমাদের তো সে ব্যবস্থা নেই।

- হুম। ভেবো না। বাই। কাজে বিজি। অন্যদিন কথা হবে।

-ওকে। বাই।

মন খারাপ ভাব কমায় বই খুলে বসে মিঠি।

আব্দুল মান্নান সৈয়দ এর " জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ" খুলে পড়তে থাকে।

নানান কাজে দিন চলে যায়। প্রায় ১৬/১৭ দিন ঘরে বসে কেটে যাচ্ছে। নাহ ! কিছুতেই মন বসে না। কি এক অস্বস্থি গিলে খায় সমস্ত ভালো লাগা।

কি বার আজ ! হ্যাঁ সোমবার ! ক্যালেন্ডার ওল্টায় সে।

হঠাৎ ফোনে নেট খোলে। ফেসবুকে দু' একটি পোষ্ট পড়ে। নিজের নোটিফিকেশনের কমেন্টের জবাব দেয়।

ম্যাসেঞ্জার খুলতেই দেখে, সবুজ হয়ে আছে অর্হ।

- হ্যালো ! অর্হ ভালো আছো?

- না। ভালো নেই। সংগে সংগেই জবাব দেয় সে। যেন প্রাণহীন একপ্রস্থ শব্দ ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে উঠে আসে ম্যাসেঞ্জারের বর্ণে আলোয়।

- কী হয়েছে?ফোন দিতে পারি?

-দাও।

মিঠি ফোন দেয়।কথা বলে।

- বলো কি হয়েছে?

- আমার দুই বন্ধু আমেরিকার নিউইয়র্কে থাকতো আজ ওরা  COVID -19 এর আক্রমনে মারা গেছে। দু' জনই আমার সাথে ঢাকা কলেজে পড়ত।

মনটা খুব খারাপ। দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাস কুন্ডলী পাকিয়ে যেন ফোনের বায়ুতে ঘুরপাক খেতে থাকে।

- ভেরি সেড। তোমাদের ওখানে কী অবস্থা?

- ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে।

যেন অনেক দূর থেকে কোনো ক্লান্ত পথিক ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে এভাবে কথা বলে সে।

- চিন্তা করো না। সাবধাণে থেকো।

- হুম। তোমরাও সাবধানে থেকো। আজ রাখি।

ফোন রাখতে রাখতে মিঠি শুনতে পায়, হা হা হাচ্চু!!!

হাঁচির শব্দটি মিঠিকে নির্বাক করে দেয়

 

                                         সমাপ্ত 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন