বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

সন্ধ্যা রায়

 

                                     ভ্রান্তি

                                      সন্ধ্যা রায়  

 

আমি পল্লবী মিত্র। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। আমার স্বামীও এখানে হাইস্কুলের শিক্ষক। স্কুলের প্রেয়ার, মিটিং, খেলাধুলো, পুজো সব

এক সাথেই হয়। এখানে আসার কিছু দিন পরই আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। হেডমাস্টার কেমন যেন আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন ! আমি তাঁকে বেশ এড়িয়ে চলি। এক দিন এনওয়াল মিটিংয়ে আমার সহকর্মী দীপিকা বলেই বসলো, দিদিভাই, খেয়াল করেছো--হেডসার কেমন যেন তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। 

আমার মানা করার জো নেই, বলেই দিলাম, হ্যাঁ আমি খেয়াল করেছি। আমি বেশ অস্বস্তি ফিল করি। বললাম, কি আর করব বল? ও আর কিছু জবাব দিল না।

মিটিং, খেলাধুলা, রিহার্সাল, কোথাও বাদ নেই সব সময় উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সবাই কি ভাববে ? আমি স্বামীকে বলতে সাহস পেলাম না। সব সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সবাই কি ভাববে ? আমি স্বামীকেও বলতে সাহস পাই না। কিন্তু রেহাই নেই। সকালে রোজ প্রিয়ার  লাইনেও তাই। আমি মনে মনে খুব রেগে যাই, ভালো লাগে না। স্কুলের শিক্ষিকা, ফাঁকি দেবার উপায় নেই। আমি সময় মত না গেলে বাচ্চাদের কি শেখাবো ? কিন্তু দাঁড়াবার উপায়ও নেই। হেড মাষ্টার মশাইয়ের এই ব্যবহারের কি জবাব দেবো আমি ? সবাই এটা দেখছে, বুঝতে পারছে, মাত্র ছমাস হয়েছে আমি এসেছি এখানে। আমাদের ট্রান্সফারের তো এখন কোন উপায়ও নেই। 

সরস্বতী পুজো এলো। কোন কাজ মন দিতে করতে পারি না। হেডমাস্টারের চোখ দুটো আমার উপরে নিবন্ধ আমি জানি। পুজো শেষ, পরীক্ষা শেষ, সবার কানাঘুষো বাড়ছে। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকি, ভাবি হাই স্কুলের ছেলেমেয়েরা বড়, কেউ যেন কখনো কমেন্টস না করে ফেলে। 

এক দিন মৃণালিনী ম্যাডাম তো বলেই বসলো, পল্লবী দি, এক দিন হেডমাস্টারকে তুমি ডাইরেক্ট জিজ্ঞাসা করো না, উনি কেন ফ্যালফ্যাল করে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকেন

আমি বললাম, এমনি জিজ্ঞাসা কি করা যায় ? উনিও চুপ। সে দিন স্বামীকে না বলে আর পারলাম না। উনি এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ওই বুড়ো মানুষটা কি করছে না করছে তুমি দেখতে যাও কেন? আমি বেশ স্বস্তি পেলাম।সা মার ভ্যাকেশন হল, যথারীতি বাড়িতে ভ্যাকেশন কাটিয়ে আসলাম। 

প্রথম মিটিংয়ের দিন হেডমাস্টার তাঁর ভাষণে উনার রিটায়ারমেন্ট ডেট ঘোষণা করলেন। শুনে আমি খুব খুশি হলাম--যাক, বাঁচা গেল, রিটারমেন্ট ডেট আসলো। অনেকে কবিতা বলল, কেউ গান গাইলো, শেষে হেড্মাস্টামশাই ভাষণে যথারীতি স্টুডেন্টদের মার্গদর্শন দিলেন, আশীর্বাদ করলেন তারপর বললেন, আমার একটা মেয়ে ছিল উনিশ বছরের। ও ক্যান্সারে মারা গেছে। ও দেখতে আমাদের পল্লবী ম্যাডামের মত--হাসি, কথা বলার ঢং, চলা সব সব--বলে তিনি মাথা নিচু করলেন। ভিতর থেকে আমার কান্না বেরিয়ে এলো। আমি সর্বসমক্ষে গিয়ে পিতৃতুল্য মানুষটাকে প্রণাম করলাম। মনে মনে ক্ষমা চাইলাম। এত দিন এই ভুল ভাবনাকে মনের ভেতর পোষন করার জন্যে।


 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন