বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

বর্ণালোক দ্বিমাসিক পত্রিকা

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০

তমা কর্মকার

 

                             একটি নির্জন দুপুর

                                      তমা কর্মকার

 

নির্মল সেদিন নির্জন দুপুরে বীনার ঘরে এলো। এসে দেখে বীনা দুপুরের ভাত ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। নির্মল ঘুমন্ত বীনার দিকে হা করে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।  এতো সুন্দর লাগলো বীনাকে যে নির্মল খানিক্ষন নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, তারপর ঘুমন্ত বীনার কপালের উপর অগছানো চুলগুলি বীনার চোখের উপর পড়েছে দেখে  নির্মল নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে দিলো অনেক সাবধানে। তবুও ঘুমন্ত বীনার নির্মলের আগুলের স্পর্শে ঘুম ভেঙে গেলো, আর বীনার আধো ঘুমের ঘোরেও সামনে নির্মলকে দেখে ভূত দেখে চমকে উঠার মতো চমকে গেলো। বীনা নিজেকে একটা চিমটি কেটে দেখলো সত্যিই সে নির্মলকে দেখছে নাকি, ও আগের মতোই স্বপ্নের ঘোরে নির্মলকে দেখছে ! বীনার ঘোর কাটলো নির্মলের কথায়, নির্মল বলল, কী গো আমায় চিনতে পারছো না ? আমি যে তোমার নির্মলহ্যাঁ গো সত্যিই আমি, আমাকে ছুঁয়ে দেখো-- 

বীনা নির্মলের কথায় তাকে জড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, তুমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে গো, আমি যে তোমাকে হারিয়ে নিজেকে কোনো রকমে বাঁচিয়ে রেখেছি। শুধু তোমার জন্য, আমি জানতাম ভগবান এত নির্দয় হতে পারে না, একদিন না একদিন তোমাকে আমার কাছে ঠিক ফিরিয়ে দেবেন। নির্মল ও বীনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, বীনা তোমার চিঠিতে আমাদের বেবি হবার খবরটা পাবার পর থেকেই সব সময় আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকতাম, বিদেশি কোম্পানি তাই চাইলেই ছুটি পাওয়া যায় না, অনেক কষ্টে যদিও বা ছুটি পেলাম তাও বসের হকুম একটি গোপন অভিযান করার পরই ছুটি মিলবে। আর তুমি তো জানো আমাদের গোপন অভিযানের খবর কাউকে জানানো যায়না, তাই আমিও কাউকে জানাতে পারলাম না। আমার গোপন অভিযানের কথা, চলে গেলাম গোপন অভিযানে, ওখান কার মিশনে এবার অনেক ঝামেলা হল। বেশ কয়েক জন মারাও গেলো, আমি অনেক আইনি হুজ্জতি পূরণ করে তারপর ছুটি পেলাম আর ছুটি পেতেই চলে এলাম আমার সন্তান আর আমার সন্তানের মায়ের কাছে, বীনা কোথায় আমাদের সন্তান

বীনা নির্মলকে ছেড়ে পাশের ঘরে বীনার মায়ের কাছে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত সোনাইকে তুলে এনে নির্মলের কোলে দিয়ে বলল, এই নাও তোমার মেয়ে নীলাকে-- 

নির্মল নীলা ও বীনাকে দু হাতে দুজনকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে পরম সুখশান্তির নিঃশাস ফেললোদুপুরের নির্জনতা কাটিয়ে দূরের স্কুলে ছুটির ঘন্টা      বাজলো|

                                     সমাপ্ত 



জয়া গোস্বামী

 

                                   চটি জোড়া 

                                     জয়া গোস্বামী  

 

সে দিন কেয়া সকাল থেকে একটু খুশিতে আছে । মনে শান্তি আছেসারাদিন টিউশন পড়াতে পড়াতে মনটা অসহ্য হয়ে উঠেছে তাও সে খুশি। বাবার কারখানায় কাজটা চলে গিয়েছে অনেক দিন হয়েছে। ওর উপর সংসারটা, পুরো ওর কাঁধে এসে পড়েছে l সে মুখে কিছু বলে না, হাসি মুখে মায়ের সাথে কাজ করে আর বাচ্চাদের পড়াতে ব্যস্ত থাকে l কি করে দুটো পয়সা হবে এই ওর আশা। ওর বন্ধুরা অনেক কথা বলে l ও সে দিকে কান দেয় না l গরিব মানুষ নিজেদের নিয়ে থাকে । আর ছোট বেলার বন্ধু হিমু ওর খুব প্রিয়, ও আসে ওর সাথে কথা বলে । ও এলে ইদানিং একটু বেশি খুশি হয় কেয়া, হয়ত বয়েসের জন্য হবে এটা। এই ভাবে ওরা কবে বড় হয়ে যায় বুঝতে পারে না l একটা একটা করে দিন যায় আর মনের কোনে নতুন সংসার পাতার স্বপ্ন এসে ভিড় করে l ওর খুব ভালো লাগে, কল্পনার জগতে হিমুকে ও রোজ স্বামী হিসেবে দেখে l এভাবে অভাবের সংসারটা চলছে l গ্রামে মেলা এলো l ওর খুব সখ যাবে মেলাতে l একটু একটু করে পয়সা জমায় মেলার জন্য l সখ কাঁচের চুড়ি পরবে l এটা সেটা কিনবে এসব চিন্তা করতে করতে ওর দিন চলে যাচ্ছে । মা দেখে মেয়ে আজ কাল একা একা হাসে, কথা বলে । মায়ের মনে ভয় জন্ম নেয় এটা আবার কি হচ্ছে! মেয়েকে সে দিন কাছে ডেকে অনেক বুঝিয়ে বলল, তুমি যেটা করছ মা সেটা ভুল--হিমুরা বড়লোক ওদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব হতে পারে না l কেয়া ভাবে, মা তুমি ভুল করেছো। সে চুপ করে মার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে, মা ভুল ভাবছে, এটা হবে না  হিমু তাকে খুব ভালোবাসে । ও সে দিন মাকে বলে, আমি মেলায় যাবো মা

খুব খুশি হয়ে মা মাথা  নেড়ে মেয়েকে অনুমতি দেয় । সারাদিন নিজেকে নতুন করে সাজাতে থাকে কেয়া, একটি শাড়ি তাও মলিন, কি ভাবে যাবে ও ? তাও ওটাই পরে সে যাবে ঠিক করে নেয়, এই করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো l আজ হিমু ওকে কি বলবে ? তার জন্য ও উদগ্রীব হয়ে আছে l মনে মনে ভেবে নেয়, কেয়া ওদের বিয়ের কথা বলবে

আকাশ কুসুম চিন্তা নিয়ে পথে হাঁটতে লাগলো কেয়া। কিছুটা যেতে গিয়ে ওর এক পাটি চটি ছিঁড়ে যায় l কি করবে ভেবে পায় না সে--কি ভাবে যাবে হিমুর কাছে । মনে মনে কেঁদেই ফেলে সে, হাতে একশত টাকা, কি করবে তা দিয়ে সে? চটিজোড়া কিনবে নাকি যাবে হিমুর কাছে । চিন্তায় পড়ে যায় সে l সে নিজের জন্য চিটি কিনে পরে নেয় l একটু দেরি হয়ে যায়, এই সব কেনাকাটা করে গিয়ে যখন পৌঁছল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে l হিমুর সাথে দেখা করবে ভেবে ভেবে খুশিতে সে শেষ হয়ে যাচ্ছে l কি বলবে আজ ওকে । 

কেয়া দূর থেকে দেখল দাঁড়িয়ে, হিমু, ওর জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু পাসে ও কে ! চিনতে পারছে না--নাকি চিনতে ওর মন চাইছে না ! হিমু চিৎকার করে ওর নাম ধরে ডাকল, কেয়া

কেয়া অস্তে করে সারা দিলো, আমি এখানে 

কেয়া দেখে ওর বান্ধবী মালা হিমুর হাত ধরে দাড়িয়ে আছে। এক মুখ হেসে হিমু ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, অনেক কথা বলার পরে হিমু বলতে লাগলো, কেমন দিলাম বল

কেয়া আবার আস্তে করে বলতে লাগলো, জবাব হয় না--হিমু খুব সুন্দর--তোদের দুটিতে মানাবে, বলে হন্তদন্ত হয়ে পেছন ফিরে বাড়ির পথে রওনা হল কেয়া । সে হাঁটতে লাগলো আর মনে মনে বলতে লাগলো, গরিবদের স্বপ্ন দেখতে নেই, যার পায়ের এক জোড়া চটি জোড়া থাকে না তার কিসের আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখা !



মৌ ঘোষ

 



                            রক্ষক যখন ভক্ষক

                                      মৌ ঘোষ

 

তিনতলা বিশাল বাড়িতে সেদিন অন্ধকার নেমে এলো,আঠাশ বছরের বিধবা বৌমা দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে যেন কর্পূরের মত উবে গেল।পাড়া প্রতিবেশীদের ঘুম উড়ে গেলো এটা ভেবেই যে ওমন শান্ত স্বভাবের মেয়েটি কোথায় গেল!মৈত্রেয়ী মনে মনে বুঝছিল,এই বিশাল বাড়িটায় নিজ এবং তার ছোট্ট দুটি কন্যা সন্তানের দুবেলা দুমুঠো খাওয়া ছাড়া কোনো ভবিষ্যৎ নেই।এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এর অফিসে আলাপ হওয়া নিখিলেশ হাস্যমুখে এগিয়ে এসে আলাপ করেছিল নিজে থেকেই।আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব, একটা চোরা টান,নিখিলেশ একদিন বলল আমি তোমার এবং তোমার সন্তানের দায়িত্ব নিতে চাই।হঠাৎ করেই বিয়েটা হয়েও গেল।কিন্তু বিধবা মৈত্রেয়ী নতুন সংসারে গিয়ে সমস্যায় পরে গেলো তার কন্যা সন্তানদের নিয়ে।বড়মেয়ে মাত্র বারো বছর আর ছোটটি সবে আট ।নিখিলেশ হাত বাড়ালো বড়মেয়ে তৃষার দিকে,হতবাক নাবালিকা মেয়েটিকে ভোগের পন্য করতে চাওয়া নিখিলেশ ভয় দেখালো যদি তার মনমত আনন্দ তৃষ্ণা না দিতে পারে তার মাকে ঘুমের মধ্যেই গলা টিপে মেরে ফেলবে।ভয়ে জড়োসড়ো মেয়েটি মাকে বলতে পারলোনা তাদের নতুন এই বাপীর কীর্তি।দিনের পরদিন চললো তৃষার ওপর মানসিক অত্যাচার, মৈত্রেয়ী আন্দাজ করতে পারছিল কিছু একটা অগোচরে ঘটছে।তুমুল এক অশান্তির মধ্যে তৃষ্ণা ভয়ে একদিন কান্নাকাটি করলো ছোট্ট বোনটার কাছে।শ্রেয়ান মৈত্রীর ছোট মেয়ে,দিদিকে এই পিশাচের হাত থেকে কিভাবে বাঁচাবে ভাবতে বসলো,দিদিকে বললো আজ থেকে তুই ঐ লোকটা ডাকলে একদম যাবিনা দিদি,যা বলার আমি বলবো,সেই মত মধ্য রাতে নিখিলেশ ঘরে এলো,দুবোনেই জেগে,তৃষ্ণা ভেবে যেই নিখিলেশ শ্রেয়ানের গায়ে হাত দিল,শ্রেয়ান চিলচিৎকার করে মাকে ডেকে উঠলো,মৈত্রেয়ীর ঘুম ভেঙে গেল,দৌড়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখলো নিখিলেশ ধমকানি দিচ্ছে তার প্রানের টুকরোকে।বিষয়টা বুঝতে বাকি আর রইল না।চোরের মায়ের বড়গলা নিখিলেশ সেপথেই গেল,মৈত্রেয়ী বাপের বাড়িতে তার মেয়েদের রেখে এলো কিছু দিনের জন্য, কিন্তু নিখিলেশ মৈত্রেয়ীর কাছে ক্ষমা চেয়ে, কান্নাকাটি করে ,দুই মেয়েকে আবার ফিরিয়ে আনলো।মৈত্রেয়ী ভাবলো সে বোধহয় শুধরে গেছে,কিন্তু ভুল ভাঙতে সময় বেশিদিন লাগলোনা। অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে মৈত্রেয়ী, ডাক্তার বেডরেষ্টে থাকতে বলেছেন, ঘুমের মধ্যেই মৈত্রেয়ী শুনলো ছোট মেয়ের চিৎকার, ছুটে গেল মৈত্রেয়ী, বিস্ফোরণ ঘটলো ছোট্ট ঘরটায়, এলোপাতাড়ি ছোট্ট মেয়েটাকে মারছে নিখিলেশ।কেন না অবাধ্য মেয়ে নাকি তাকে অপমান করেছে,ছোট্ট মেয়েটার গলায় একরাশ ঘৃনা, সে বলে চলেছে কিসের জন্য দিদিকে রাতে র অন্ধকারে ঐ লোকটা ডাকছিল!মৈত্রেয়ীর বুঝতে বাকি রইলো না,মৈত্রেয়ী  এও শুনলো তার মেয়ে বলছে মা রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে।সাবধান মা,ঐ লোক টা আমাদের বাঁচতে দেবেনা, বাঁচতে দেবে না।


কাবেরী তালুকদার

 


                                অস্তিত্ব নেই

                             কাবেরী তালুকদার

 

রাত পৌনে বারোটা বাজে।সব কিছু সেরে আমি খেতে বসেছি।সবাই যে যার ঘরে ঢুকে গেছে। শুধু মাংস আর দুটো রুটি খাবো।হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠলো।এত রাতে ফোন , নিশ্চয়ই কোন দুসংবাদ।না , ধরবো না। খাওয়াটা মাটি হবে।থেমে থেমে তিনবার বাজলো।মিস কল। বুঝলাম রত্নার ফোন।রত্নাই একমাত্র ছিল যে এমন মিসকল দিয়ে ফোনে কথা বলে।রত্না আমার ন, কাকার মেয়ে।একটু পরে ভুলেও গেলাম। আবার পরের দিন সেই রাত বারোটা এবং মিসকল।এবার রাগ হোলো।রত্নাকে বকতে হবে।রোজ রোজ রাত বারোটায় ফোন, ইয়ার্কি না কি।খেয়ে উঠে এমন ঝাড় দেবো, ইয়ার্কি করা বেরিয়ে যাবে। কিন্তু আবারও ফোনের কথা ভুলে গেলাম। কিন্তু সকালে উঠেই মনে হলো 

আজ যদি করে ধরবোই ধরবো।একটা কথা, আমি নাম্বার সেভ করতে পারি না। আজ কিন্তু আমি খুব অ্যালার্ট।আগে খেয়ে নিয়েছি। যথারীতি বারোটা বাজলো। এবং রিং বাজলো। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফোন ধরে ফেললাম। বলে উঠলাম ,'রত্না , ভালো হচ্ছে না।দেখি হলে মজা টের পাইয়ে দেবো।'ওপর প্রান্ত থেকে ভরাট গলার এক পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো 'কেমন আছো প্রিয়া?' অবাক হয়ে বললাম 'কে আপনি?চিনতে পারলাম না। আমার নাম আর নম্বর কোথায় পেলেন!'অল্প হাসলেন ভদ্রলোক। বললেন ',আমাকে চিনতে পারলে না।একলা বাড়িতে যার সঙ্গে মনে মনে কথা বলে ,দিনটা কাটিয়ে দাও ,সেই আমি।',চমকে উঠলাম।সত্যি একা একা বাড়িতে সারাটা দিন আমি কাটিয়ে দিই আমার কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সঙ্গে।কত গল্প করি ,গান শোনাই, , কিন্তু জানলো কি করে।জিজ্ঞাসা করলাম।বললো, 'শুকতারা র সূক্ষ্ম আলো দুই প্রান্তে দুটি মনকে বেঁধে রেখেছে।তাই ভুলতে চাইলেও ভোলা যাবেনা।'অনেক গল্প হলো।তার প্রিয় গানটাও গাইললাম।এবার বিদায়ের পালা।আনন্দে ভরা মন নিয়ে শুতে গেলাম।কাল আমি ফোন করবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে।পর দিন রাত বারোটা কিন্তু খুব দেরি করে এলো। কিন্তু এলো। আমি ফোন করলাম ।শুনলাম এই নম্বরের কোন অস্তিত্ব নেই।

                                      সমাপ্ত



শংকর ব্রহ্ম

 


                          অণুগল্প পেত্নির সঙ্গে প্রেম 

                                       শংকর ব্রহ্ম  

 

বললে আপনারা কেউ বিশ্বাস করবেন না জানি,তবু বলি। এ'বছর ২রা মার্চ আমার পরিচয় হয় সুনীতা রায়ের সঙ্গে। ওই দিন আমার জন্মদিন ছিল। অনেকেই সে দিন আমাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানায়, সুনীতা তাদের একজন। সে আমার বন্ধুলিষ্টে ছিল না। সে দিনই তাকে বন্ধুত্বের রিকোয়েষ্ট পাঠাই। সঙ্গে সঙ্গে সে গ্রহণ করে। তারপর দু' একদিনের মধ্যে শুভেচ্ছার পালা শেষ করে আমরা দ্রুত অন্তরঙ্গ হয়ে পড়ি। অন্তরঙ্গতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যে মেসেঞ্জারে আমরা সেক্সচ্যাটে জড়িয়ে পড়ি। প্রথম দিকে একটু দ্বিধা দ্বন্দ্ব আমার থাকলেও, অল্প দিনের মধ্যে দু'জনেই সে জড়তা কাটিয়ে সাবলীল ভাবে রগরগে আলোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। প্রতিদিন রাত বারটার পর, সে আসত। রগরগে আলোচনায় রাত ফুরিয়ে যেত। ইতিমধ্যে আসানসোল থেকে রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে এক সাহিত্য সম্মেলনে আমার আমন্ত্রণ আসে। সুনীতাও আসানসোল থাকে। ভাবি, সম্মেলন শেষ হলে তার সঙ্গে একবার দেখা করব। সেই মতো তাকে জানাই, আমি আসানসোল যাচ্ছি। সে খুশি হয়ে, জানায়, তাহলে আর মুখে আলোচনা নয় শুধু, বাস্তবে আমারা লিপ্ত হচ্ছি। আমি তার কোন উত্তর দিতে পারি না। ৯ই মে গিয়ে হাজির হই সম্মেলনে। অনুষ্ঠান শেষে, একটা ট্যাক্সি নিয়ে ওর দেওয়া বাড়ির ঠিকানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। রাত দশটার পর সেখানে গিয়ে হাজির হই। ঠিকানা মিলিয়ে দরজায় কড়া নাড়তেই, কিছুক্ষণ পর এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে বললেন, কাকে চাই? আমি সুনীতার নাম বলতেই, তিনি যেন বিস্ময়ে আমার মুখের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। আমি অস্বস্তি বোধ করি। বলি, সুনীতা নেই? - আপনি কোথা থেকে এসেছেন? - কলকাতা, আপনি সুনীতাকে একটু ডেকে দিন। - কাকে ডাকব? - সুনীতা। - সে তো দু'মাস আগে মারা গেছে, আপনি জানতেন না? - কি করে মারা গেল? - কুমারী মেয়ে, কাকে ভালবেসে পেটে তার বাচ্চা নিয়ে, তার কাছে প্রত্যাখাত হয়ে, লাইনে ঝাঁপ দিয়েছে। এরপর আমি কি করে সেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম, জানি না। ফিরে এসে মেসেঞ্জার খুলে দেখি, তার সঙ্গে আমার কথোপকথনগুলো আশ্চর্যজনক ভাবে সব উবে গেছে। এমন কি বন্ধু লিস্টেও তার নাম নেই। আমি আজও এর কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।

                                       সমাপ্ত



স্মৃতি শেখর মিত্র

 


একটি শীতের রাত

                             স্মৃতি শেখর মিত্র

সময়টা ছিল ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষাশেষি। ঠিক হল আমরা মালদা যাবো। অর্থাৎ আমি আমার দুই শিশুসন্তান, স্ত্রী ও শালাবাবু। আমরা তাই রাত আটটা নাগাদ টেঁয়া এসে বসে আজিমগঞ্জ লোকাল ধরার জন্য। এবং আজিমগঞ্জ থেকে আমাদের মালদা যাওয়ার কথা। সেজন্য আমরা টেঁয়া স্টেশনে মালদা এক্সপ্রেস ট্রেনের রিজার্ভেশন করে নিলাম।

আজিমগঞ্জ লোকাল যখন টেঁয়া স্টেশনে ঢুকলো তখন স্টেশনের

ঘড়িতে রাত নটা। বেশিরভাগ বগি খালি থাকায় আমরা অনায়াসে একটি বগিতে ঢুকে সবাই এক জায়গায় বসে পড়লাম। আমরা বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে এসেছি। বাচ্চাদের জন্য পরোটা আলু ভাজা ইত্যাদি নেওয়া হয়েছে। যদি রাস্তায় ওদের খিদে পায় তো দেওয়া হবে। সঙ্গে দু বোতল  খাওয়ার জল। ট্রেনের মধ্যে বেশি মানুষজন চড়েনি। আমরা সবাই এক জায়গায় গল্পগুজব করছি এমন সময় পরের স্টেশনে একজন মানুষ চড়লেন।

তিনি ফেরিওয়ালা। লজেন্স, চানাচুর, চিঁড়ে ভাজা, খেজুর ইত্যাদি খাবার জিনিস ফেরি করেন। তিনি অত্যন্ত সদাশয় ব্যক্তি।কথায় কথায় আমাদের জানালেন আজিমগঞ্জ স্টেশনে রাতের বেলায় অনেক আওয়ারা গোছের মানুষ জনের আড্ডা স্থল।

আপনারা ওখানে নেমে সোজা স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে দেখা মালদা এক্সপ্রেস ট্রেনে মালদা যাওয়ার কথা জানাবেন এবং রাতের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করবেন। আমাদের ট্রেন যখন আজিম-গঞ্জে পৌঁছা তখন গভীর রাত। সে সময় প্লাটফর্মে যাত্রী বসে আছেন। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য যার যা সম্বল তাই ঢাকা নিয়ে বসে আছেন। আমরা গুটি গুটি স্টেশন মাস্টারের অফিস রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমি ও আমার শালা দুজন মিলে স্টেশন মাস্টারকে রাতে থাকার জন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ের কথা জানালাম। উনি রাতে আমাদের থাকার জন্য তাঁর রুমের পাশেই একটা রুমে থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন। উনি বললেন আমাদের ট্রেন লেট আছে পরদিন সকালে আসবে। সেই মতো আমাদের হাতে দুচার ঘণ্টা সময় আছে। স্টেশন চত্বরে বিশেষ মানুষজন নেই। একে তো শীতের রাত তাই কনকনে শীত পড়েছে এখানে। কয়েকজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে গল্পগুজব করছেন।

চতুর্দিক শুনশান। মাঝে মাঝে রাস্তার কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাচ্চাদের কোন রকম ভাবে ঢাকাঢুকি  দিয়ে কম্বল পেতে শুইয়ে দেওয়া হল। আমরাও দুচার ঘণ্টা হাতে সময় থাকায় একটু বসে বসে জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। একটু ঢুলুঢুলু ভাব এসেছে দুচোখের পাতায়। হঠাৎ শুনতে পেলাম কিছু মানুষের হৈ

হট্টগোল। বাইরে এসে দেখি একজন মহিলাকে তাড়া করে দৌড়াচ্ছে কয়েকজন পঁচিশ ত্রিশ বছরের যুবক। কি ব্যাপার জানতে চাওয়ায় জানতে পারলাম মেয়েটি প্রতিদিন রাতে স্টেশন চত্বরে এসে তার খদ্দেরের খোঁজ করে। ঐ ছেলেগুলির সঙ্গে দরদাম ঠিক মত না পোষানোয় ও পালানোর চেষ্টা করে। আর ঐ ছেলেগুলি মদ্যপ অবস্থায় থাকার জন্য ওকে ওরা ছাড়বে না। স্টেশনের যাত্রীদের এ ব্যাপারে কোন হেলদোল নেই। রোজকার এই ঘটনায় ওঁরা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আমরাও পরিবার নিয়ে আনজান জায়গায় কোন কিছু করার ঝুঁকি নিলাম না।

বসেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দিলাম।

                                         

                                        সমাপ্ত



উৎপল পাল


সেলাই মেশিন

উৎপল পাল


একুশ বছর পর আজ রমলা দেবীর বৃদ্ধাশ্রম বাস শেষ হবে। তার আনন্দ অশ্রুতে মনে পরে যাচ্ছে অতীতের অনেক কথা। তুহিনের বয়স তখন মাত্র আট বছর। একটা ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যায়। রেল কর্তৃপক্ষ মৃত বক্তিদের পরিবার পিছু দু লক্ষ টাকা দিয়েছিল। সেই টাকায় রমলা দেবী একটা সেলাই মেশিন কিনেছিলেন আর বাকি টাকা তুহিনের পড়াশোনার জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন। বাড়িতে বাচ্চাদের পোশাক বানিয়ে বিক্রি করে যা আয় হত তা দিয়ে মা ছেলের মোটামুটি চলেই যেত। রমলা দেবী দিনরাত সেলাই মেশিন চালিয়ে ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। ছেলে একদিন মস্ত বড় হয়ে তার কষ্ট দূর করবে। ছেলেও মায়ের স্বপ্ন পূরণের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল। মাধ্যমিকে দ্বিতীয়, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম। তারপর কলেজ। শেষে নামি কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি। অতঃপর বিয়ে। পুরোনো সবকিছু ছেড়ে তারা এলেন নতুন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। ঠিক দু বছর পর রমলা দেবী ঠাম্মী হলেন। নাতির নাম রাখলেন সুজয়। কিন্তু সুজয়ের আধুনিকা মা সুশ্বেতার তা পছন্দ হলোনা। শুরু হলো সংঘাত। ছোটো ছোটো বিষয় হতে লাগলো অনেক বড়ো। তুহিন এসব ব্যাপারে নীরব। কারন মোটা মাইনে দেওয়া বসের মেয়ের বিপক্ষে যাওয়া তার কাছে স্বার্থপরতা। এত কিছুর পরেও রমলাদেবীর বেদনা এক নিমেষে শেষ হয়ে যেত সুজয়ের হাসি মুখ দেখে। সুজয়ও ঠাম্মী অন্তপ্রাণ। রমলাদেবীর কপালে সে সুখও সইল না। সুজয়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। সুশ্বেতা ফ্ল্যাটের বাস্তু পরিবর্তন করতে গিয়ে পুরোনো সেলাই মেশিনটা দেখে বলল, "আমার বাবার দেওয়া দামি ফ্ল্যাটে এসব জিনিস মানায়না"। তুহিন মাকে বলল এসবের আর কি দরকার? অশান্তি বাড়তে বাড়তে যখন চূড়ান্ত, তখন সিদ্ধান্ত হলো বৃদ্ধাশ্রম। রমলা দেবী সেলাই মেশিন নিয়ে চলে এলেন বৃদ্ধাশ্রমে।

আজ একুশ বছর পর বৃদ্ধাশ্রমে সুজয়ের ফোন।

সে বলল "ঠাম্মী আমি তোমাকে নিতে আসছি। তুমি আমার কাছে থাকবে। আমার বাড়ি..... না না তোমার বাড়িতে"। আমি আসছি।

        সকাল থেকেই গোছগাছ চলছে। বৃদ্ধাশ্রমের সবাই আনন্দ করছেন। আজ তাদের দর্জি দিদি চলে যাবেন। রমলাদেবী ঘোলা চশমায় দেখতে পাচ্ছেন আগামী দিনের রঙিন ছবি। হঠাৎ তার মনে পড়লো সুজয় রাবড়ি খেতে ভালোবাসে। ব্যস বেরিয়ে গেলেন নাতির জন্য রাবড়ি আনতে। কিন্তু ছোটো রাস্তা পেরিয়ে যেই বড়ো রাস্তায় উঠলেন সঙ্গে সঙ্গে এক বেপরোয়া লরি তার সমস্ত আশা, স্বপ্ন ভালোবাসাকে রাস্তায় পিষে দিয়ে গেল। পরে রইলো তার নিথর রক্তাক্ত দেহ.......।

         সুজয় আজও তাঁর সেলাই মেশিনটিকে নিজের কাছে রেখেছে। তার নিজের বাড়ি..... না ঠাম্মীর বাড়িতে।

 


প্রেরণা বড়াল

 


                                  মধুমিতা  

                                   প্রেরণা বড়াল 


তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব-----গানটা গুনগুন করতে করতে চাঁদনি রাতে একাই কীর্তনের শেষে ফিরছিল সে। ----এই মধু শোন। -- যা মোলো, বিড়বিড় করল মধু। এই সেই নন্টু ছোকরা টা। --বড্ড পিছু লেগেচে। শালার বৌ বাচ্চা আচে, তাতে মন ভরে না। প্রেম প্রেম খেলা খেলতে চায়। আদিক্ষেতা। --কি কও দাদা, জলদি কও। আমার তাড়া আচে। কেত্তন গেয়ে এমনিতেই অনেক রাত্তির হয়েচে। আবার সকালে উঠতি হবে। কাজে যাওয়া লাগবে। -- ভাবলাম তুই একা যাচ্ছিস, তা একটু এইগে দেই। -- ও---, মধুমিতা পা চালিয়ে হাঁটতে থাকে। গাটা একটু ছমছম করে। - কি জানি শালার কি মতলব। পুরুষ ছেলে দেখলেই আজকাল তার স্বার্থি আর মতলবি বলে মনে হয়। আজ সে একেবারে একা। তার ভবিষ্যত পাঁচ বছরের ছেলে। পেটের দায়ে ওকে মায়ের কাছে রেখে কাজে যেতে হয়। এক সময় তার ও একটা সুন্দর সংসার ছিল। ওরা প্রেম করেই বিয়ে করেছিল। শুরুর দিনগুলো ভাবতেই শরীর মন কেমন যেন হয়ে যায় তার। মা বাবা আদর করে তার নাম রেখেছিল মধুমিতা। কিন্তু স্বামীর কাছে কি মধু, মিতা হয়ে উঠতে পেরেছিল ? না কেবল মধু --ছিল। নইলে আরও একটি বিয়ে কি করে করলো সে। মনের দুঃখে ছেলেকে নিয়ে মায়ের সংসারে এসে উঠেছে। হঠাত্ নন্টুর কথায় ভাবনাতে ছেদ পড়ল। -- কি সুন্দর চাঁদনি রাত তাই না ? --হুম, তুমি চইলে যাও। ওই তো সামনে বাড়ী। আলো দেখা যাচ্ছে। -- ঠিক আছে। বাড়ীতে এসে পা ধুয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল মধুমিতা। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে ছেলের মুখের উপর। আহা কি সুন্দর। ওর দিকে তাকিয়ে সমস্ত কষ্ট ভুলে যায় নিমেষে। ওকে খুব ভালো করে মানুষ করতে চায় সে। ছেলে বড়ো চাকরি করবে-পরীর মতো একটা বউ আসবে ঘরে - এমনি চাঁদনি রাতে ওরা কতো প্রেম করবে--। নিজের জীবনে যা কিছু পায়নি, সে সবই দেখতে চায় ছেলের জীবনে। স্বপনের জাল বুনতে বুনতে কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়ে। 


চিত্তরঞ্জন গিরি

 

বন্ধন

                                  চিত্তরঞ্জন গিরি

 

নাইনাই করে প্রায় তিরিশ খানা পাত্রী দেখানো হয়ে গেল বান্টিকে। কোনটাই তার পছন্দ নয়। বান্টি সেন্ট্রালের বড় অফিসার। পাত্র হিসেবে তার ডিমান্ড প্রচুর। কিন্তু বয়সও হয়ে আসছে ৩২ পেরিয়ে ৩৩। তার একমাত্র জামাইবাবু সে অস্থির হয়ে গেছে। প্রতিটা মেয়েকে দেখতে গিয়ে একটা দুটো প্রশ্ন করে। ওই প্রশ্নের উত্তর শুনেই সরাসরি না বলে দেয়। অথচ প্রতিটি মেয়েকে দেখতে সুন্দরী।

আজ বেহালায় একটি মেয়েকে দেখতে তার বাড়িতে ঢুকেছে। প্রশ্ন জামাইবাবুকে আর করতে হয় না। বান্টি মেয়েকে জিজ্ঞেস করে। আজও তাই। মেয়েটিকে দেখে জামাইবাবু বুঝতে পেরেছে এও "না" এর দলে। তাই চুপচাপ শ্রোতা হয়ে বসে থাকা। বান্টি প্রশ্ন করে"তোমার কোন ছেলে বন্ধু আছে। বা কাউকে ভালোবেসে ছিলে ?"

মেয়েটি প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে যায়। পাশে বসে থাকা মেয়েটির বাবা-মা সঙ্গে সঙ্গে বলে না না না এরকম কোন কালেই ছিলনা। আমার মেয়ে সেই রকম নয়।

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বলে" ভুল কথা। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় একটা টিউশন মাস্টার কে আমি ভালবেসে ছিলাম। ইলেভেন টুয়েলভে আরেক জনকে। গ্রাজুয়েশনে কলেজের সিনিয়র এক দাদা কে। তারপর মাস্টার্সে বা এখনও পর্যন্ত কাউকে নয়। অনেকেই এসেছিল বা আসছে ফিরিয়ে দিয়েছি।"

বান্টি জিজ্ঞেস করে-কেন ?

মেয়েটির বলে--পবিত্র বন্ধন এর অপেক্ষায় আছি। আমৃত্যু কাল যেন তাকেই ভালোবাসতে পারি।

বান্টি জামাইবাবুকে বলে --" মেয়েটি যদি আমাকে পছন্দ করে। তবে তার বাবা মাকে বল বিয়ের ডেট ঠিক করতে।"


চন্দ্রাণী বসু

 


                                    অভিমান

                            প্রতিমা রায়বিশ্বাস 

 

হঠাৎ চেঁচামেমিতে ঘুম ভেঙে যায় রঞ্জনের।

ফ্ল্যাট বাড়িতে অভ্যস্ত স্ত্রী মিতার প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল এই বাসাটা ভাড়া নেয়ার ব্যাপারে। কিন্তু  প্রাক্তন মালিকের বেঁধে দেয়া সময়ে পছন্দ সই বাসা না পেয়ে বাধ্য হয়েই দুইরুমের, গ্যাস ছাড়া এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছিল।

বেলা এগারোটা বাজে। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই,বাচ্চাকে কি খাওয়াবে? কোন বন্দোবস্ত নেই। তা নিয়েই মিতার যুক্তি সংগত রাগ রঞ্জনের উপর।

ঠিক তখনই ফোনটা পেল । ফোন করেছে দিদি নীলা। প্রথমবার কেটে দিলেও দ্বিতীয় বার না ধরে পারলো না । কারণ সে জানে বিশেষ সমস্যা না হলে দিদি ফোন দেয় না।

ওপাশে দিদি কান্না জড়ানো কন্ঠে বললো,হ্যালো,রঞ্জন একটা দুঃসংবাদ আছে রে।

রঞ্জন বললো, →কি হয়েছে ?

তোর দাদাবাবুর বোন, অহনা মারা গেছে রে। 

হায়,হায়! কখন? কিভাবে?

গতরাতে। শ্বাসকষ্ট হয়েছিল।

এখন আমি কি করতে পারি

তোর দাদাবাবুকে ফোন করে দেখ কি বলে।

আচ্ছা। আমিও ভীষণ সমস্যায় আছি। 

কি হয়েছে? কি সমস্যা?

বাসায় গ্যাস নেই,বাথরুমে একফোঁটা পানি নেই,কারেন্ট নেই,ঘরে কোন খাবার নেই,দোকান পাটও সব বন্ধ। আমি এখন কি করি?

বউকে নিয়ে এখানে চলে আয়।

দাঁড়া ও কে বলে দেখি।,,,,না,ও আসবে না। 

তাহলে আর কি করবি? ওরা না এলে তুইই চলে আয়। 

আচ্ছা দেখি। 

নীলা একটু ভাত রান্না করে রাখলো। ভ্যাপসা গরম, আকাশের অবস্থা কখনো অন্ধকার, কখনো চড়া রোদ। না, তখনও রঞ্জন আসেনি। বারোটার দিকে পলার ফোন। হাসপাতাল থেকে বলছে,

রঞ্জনকে বল  শ্মশানের জিনিসপত্র গুলো দিয়ে যেতে। সনাতন কিনে রেখেছে। বলে ফোন রেখে দিল।

কতগুলো কাক কা কা করে চক্রাকারে ঘুরছে। মন উতলা হয়ে ওঠছে নীলার  শাশুড়ী মা কে জানানো হয়নি অহনার মৃত্যুর কথা।

এদিকে আকাশের পরিবেশ অনেকটা ভাল হলেও,নীলা জানে না এখন রঞ্জনের পরিবেশ কি? ভালো না খারাপ। পাশাপাশি দুটো সমস্যাই গুরুতর। তবুও ফোন দিলো উপায়হীন নীলা। বললো,,

একটা কাজ করে দিতে পারবি?

কি বল।

শ্মশানে কিছু জিনিস পত্র দিয়ে আসতে পারবি? কিছু করতে হবে না,ধরতেও হবে না। কাউকে ছুঁতে হবে না।দিয়েই চলে আসবি,পারবি

একটু চুপ থাকে রঞ্জন। হয়তো খুব সঙ্গিন তার পারিপার্শ্বিকতা। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে।

না পারলে বল। আমি অন্যকেউ কে দেখে ডেকে পাঠাবো। 

না,ঠিক আছে,আমিই দিয়ে আসবো। গুছিয়ে রেখে দে। আসছি।

গুছানোই আছে। 

কিছুক্ষন পরে রঞ্জন এসে দিয়ে এলো। 

রঞ্জন কাউকে ছোঁয়নি। জিনিসগুলো দিয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিল। কথা বলেছে দূরত্ব বজায় রেখেই।

পলা তার বোনকে, বিজন তার স্ত্রীকে, ছেলে তার মাকে সর্ব শক্তি দিয়ে ভাঙা বুকে মাথার উপর দিয়ে চিতায় তুলে দিল। করোনা রুখে দিলো মানবিকতা। সেচ্ছায় কেউ আসেনি সাহায্য করতে। ডাকেনি ওরাও। যার চলে যায় সেই তো জানে কতোটা বেদনা।  

বিমর্ষ সন্ধ্যা নামিয়ে সূর্য পাটে গেছে, নেমে আসছে অন্ধকার। শেষ হয়নি দাহ, কেউ কেউ চলে যাচ্ছে। চলে এসেছে রঞ্জনও। বৌকে বলেছিল একটু গরমজল বসাও, স্নান করে দোকানে যাবো। 

মিনিট পাচঁ পরে ফিরে এসে দেখতে পেলো সামনে আগুন পাহাড়। তার বউ। বল্ল 

শ্মশানে গেছলি ক্যান? ',--শ্মশানে গেছলি ক্যান?কথা কস্ না ক্যান

রঞ্জন বলে, আমি কিচ্ছু  ছুঁইনি,ধরিনি। শুধু জিনিসগুলো দিয়ে এসছি। সরো তো, যাইতে দাও।

এক পাও এগুবি না। বাসায় ঢুকলে খুন কইরা ফেলামু। যেভাবে আইছস হেইবায় যা।

লজ্জায় অপমানে রঞ্জন কথা বাড়ায় না। আবাসিক এলাকার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর কথায়  নাজেহাল হওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই উত্তম মনে করলো।  

মিতা ভাবেনি রঞ্জন চলে যাবে। তার নিজেকে পরাজিত মনে হতে লাগলো। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, করোনার রোগী মারা গেলে বাপে যায় না ছেলেরে দেখতে, ছেলে যায় না বাপেরে দেখতে সে ক্যান গেছিলো? সে ক্যান গেছিলোসে কি কাঁচা আবু? যুগের বাও বুঝেনা

রঞ্জন যেতে পারতো মায়ের কাছে। অথবা দিদির বাসায়। কিংবা কোন বন্ধুর বাসায়। না, সে কোথাও যায়নি।

অভিমান বুঝেনি কেউ।